আপনকথা-যাপনকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আপনকথা-যাপনকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

আপনকথা-যাপনকথা : ৩



গ্রামের নাম দেবগড় কিংবা শক্তিগড় হবে ঠিক মনে পড়ছে না আজকের কথা তো নয় ১৯৭৮ কিংবা তারও আগের কথা হবেতবে ১৯৬৪ সালের আগে নয়এই গ্রামে আমাদের খুব ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল বাড়ি বলতে টালির দোচালায় দর্মার বেড়া দিয়ে তৈরি আমার বাবার প্রথম বাড়িছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতিগুলি জুড়ে জুড়ে মালা গাঁথার চেষ্টা করছিবাড়ির পশ্চিমদিকটায় একটা সরু গলি, অনতিদীর্ঘ এই গলি বনগাঁ-রানাঘাট লোকাল চলাচলের রেললাইনে এসে শেষ হয়েছে এ সময় এখান দিয়ে স্ট্রিম ইঞ্জিনচালিত ট্রেন চলত রেললাইন টপকালেই সোজা আমার স্কুল যাওয়ার পথ স্কুলপথে ডানদিকে ঘন লম্বা লম্বা অড়হর ডালের ক্ষেত পড়ত একটু হাঁটলেই একটা নিঃসঙ্গ বাবলাগাছ দেখতে পাওয়া যেত এই গাছের সাদা সাদা বড়ো বড়ো কাটা সবসময় যেন জেগে থাকতআর কিছুক্ষণ হাঁটলেই আমাদের স্কুল ছিল প্রাইমারি স্কুল পড়াশোনায় অ্যাডভান্স থাকায় এই হেডমাস্টারমশাই ক্লাস টুতেই ভরতি করে নেন আমার পিতৃদত্ত নামস্বপনবদলে দিয়ে হেডমাস্টারমশাইবিপ্লবনাম করে দিলেন যদিও আমাদের ভাইবোনেদের পিতা রাখেননি, মাতাই রেখেছেন যেহেতু বাবার নামের আদ্যাক্ষর উচ্চারণমানে সন্তোষ ছিল, তাই ভালোবাসার চিহ্ন হিসাবে আমার নাম স্বপন, বোনের নাম সিপ্রা, ছোটো ভাইয়ের নাম সমীর রেখেছিলেন আমার মা প্রাইমারি স্কুলের ওপাশে কী ছিল মনে করতে পারছি না

আমাদের বাড়ির পূর্বদিকটায়, আমাদের বাড়ির পিছনে ছিল একটা ছোটো জলা জলার ওপারে সারি সারি কলাগাছ কী কলাগাছ ছিল জানি না সম্ভবত বিচিকলা বা দয়াকলার গাছ ছিল কলাগাছের পরেই অনেক বিস্তৃত সবুজ ঘাসের গালিচা পাতানো জমি ছিল যেন ওই জমির বাঁদিকে বিশাল বড়ো একটা ঝাঁকড়া আমগাছ ছিল মনে পড়ছে এই গাছটায় প্রচুর আম ফলত খুব নীচেও আম ফলে থাকত জমিতে ঘাসের গালিচায় আমগাছের ডালগুলি এমনভাবে চুমু খেত যে পাঁচ-সাত বছরের বাচ্চাও ছুঁয়ে ফেলতে পারত জমির ওপাশে কী ছিল মনে করতে পারছি  না
 
আমাদের বাড়ির দক্ষিণদিকে প্রথমে মীরা-মাসির বাড়ি মীরা-মাসির বাড়ির পরেই কল্পনা-মাসির বাড়ি কল্পনা মাসি আমার মায়ের খুব ভালো বান্ধবী ছিল আমি মাসি বললেও কল্পনা-মাসি মাকে বউদি বলত কেন জানি না কল্পনা-মাসি প্রতিদিন আমার মায়ের কাছে আসত বাংলা আধুনিক গানেরঅনুরোধের আসরশোনার জন্যতখন আকাশবাণীর খুব জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এটি আড়াইটে কিংবা তিনটে থেকে শুরু হত আধ ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান ছিল মনে হয় ঠিক মনে পড়ছে না তখন  রেডিয়োই ছিল মানুষের কাছে একমাত্র বিনোদন-যন্ত্র লাইসেন্স ছাড়া রেডিয়ো কেনা বা বাজানো যেত না বছরে একবার পোস্ট অফিসে গিয়ে লাইসেন্স ইস্যু করে আসতে হত কোনো একদিন অনুরোধের আসর শুরু হল, শেষও হয়ে গেল কিন্তু কল্পনা-মাসি এল না চিন্তা হচ্ছিল মায়ের মা পায়চারি করছিল কে যেন মাকে ডাকছে, “বকুলদি বকুলদিমা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে উদভ্রান্ত মীরা-মাসি, আর কল্পনা-মাসির বাড়ির লোকজন কল্পনা-মাসির মা আমার মাকে জিজ্ঞাসা করল, “বকুল, কল্পনা কোথায় গেছে বলতে পারিস ?”

মা বলে, “আজ কল্পনা আমাদের বাড়ি আসেনি তো !” সব গণ্ডগোল হয়ে গেছে, কল্পনা-মাসির বাড়ির লোকজন বোধহয় বুঝতে পারছিল
 
মা জিজ্ঞাসা করল, “রাগারাগি হয়েছে নাকি ?”

হঠাৎ সবাই পশ্চিমদিকের রেললাইনের দিকে ছুটে গেল বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সকলে রেললাইনে পড়ে আছে কল্পনা-মাসির নিথর দেহ কোমর থেকে দু-ভাগ হয়ে গেছে শরীরটা অনেকদিন পর মার কাছ থেকে শুনে ছিলাম, সুন্দরি হলেও কল্পনা-মাসির গায়ের রং খুব কালো ছিল এই কালো রঙের জন্য কল্পনা-মাসির বিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বয়সও বেড়ে গিয়েছিল অনেক পাত্রপক্ষ দেখতে আসে, খায়-দায়, আবার মুখ মুছে ফিরে যায় কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মা হতাশ হয়ে পড়ে কল্পনা-মাসিকে এই কারণে প্রচুর গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছিল এমন অপদার্থ মেয়ের লাইনে গলা দিয়ে মরা উচিতবলে  কল্পনা-মাসির মা নিদান দিয়ে দেন সেদিন মা-মেয়ের ঝগড়া-মনোমালিন্য এইভাবেই চরমে পৌঁছেছিল

আমাদের বাড়ির উত্তরদিকে একটা মাটির দীর্ঘ রাস্তা ছিল রাস্তার ওপারে কী ছিল মনে পড়ছে না রাস্তার পূর্বদিক গিয়ে মিশেছে একটা জনপদ ছাড়িয়ে লেভেল ক্রসিংয়ে, রাস্তার অপরদিক, পশ্চিমদিকে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে মনে পড়ছে নাতবে পশ্চিমদিকের একটা বাড়িতে পূর্ণিমা-মাসিরা থাকত তাঁর মায়ের সঙ্গে পূর্ণিমা-মাসির স্বামী বিহারে থাকে বিহার থেকে বছরে এক-আধবার এসে মাসির সঙ্গে রাত কাটিয়ে ভোর হলেই চম্পট দিত এই মাসিকে ঘিরে আমাদের মায়ের সঙ্গে বাবার তুমূল ঝগড়া হত সে গল্প অন্য আর-একদিন বলা যাবে

একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি মা ঘরে নেই বাবা খুব গম্ভীর মুখে চৌকির উপর বসে আছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “বাবা, মা কোথায় গেছে ?” বাবা বললেন, “তোর মা মরতে গেছে রেললাইনে পারলে বাঁচা গিয়ে আমার চোখের সামনে তখন শুধুই অন্ধকার অঝরে ঝরছিল জল ছুট্টে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে আমি দিশেহারা পূর্ণিমা-মাসির বাড়ির পিছনেই চাষের জমিচাষের জমি পেরলেই রেললাইন উত্তরদিকের রাস্তা ধরে ছুটতে থাকলাম বাঁদিকের চাষের জমিতে নেমে পড়লাম সদ্য লাঙল দেওয়া হয়েছে চারদিকে বড়ো বড়ো মাটির ডেলা ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে মা হেঁটে যাচ্ছে রেললাইনের দিকে আমি ছোটো ছোটো নরম নরম পায়ে  বড়ো বড়ো মাটির ডেলার উপর দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে লাগলাম,  মাকে চিৎকার করে ডাকতে থাকলাম অনেকক্ষণ পর মা আমার ডাক শুনতে পেল এরপর বড়ো বড়ো মাটির ডেলা তুলে তুলে আমার দিকে ছুঁড়ছিল একের পর এক আমি মাটির ডেলার আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে ডানে-বাঁয়ে করতে করতে মায়ের দিকেই ক্রমশ এগোচ্ছিলাম মা হেরে গেলেন, স্নেহের কাছে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলেন আমি বললাম, “মা তোমার কী হয়েছে ? তুমি কোথায় যাচ্ছিলে ? আমার খুব কান্না পাচ্ছে মার চোখে জল, টলটল করতে করতে ঝরে পড়ল আমার বুকে মা বললেন, “এই দেখ, তোর বাবা আমার ডান পায় ব্লেড টেনে ফালাফালা করে দিয়েছেমা ডান পায়ের রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ খুলে দেখালেন কাটা অংশ, হাঁ হয়ে আছে মা বললেন, “প্রচণ্ড ঝগড়া হচ্ছিল তখন তোর বাবা দাড়ি সেভ করছিল -কথায় সে-কথায় বলল, “দেখবি কেটে দেব তোকে!” আমি বললাম, “পারবে কাটতে”? তোর বাবাদেখ, পারি কি নাবলে ব্লেড টেনে দিল পায়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম। 

পা বেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল রক্তরক্তে ভিজছিল মাটি, আমি ভিজছিলাম মায়ের চোখের জলে

আপনকথা-যাপনকথা : ২



সবার গার্লফ্রেন্ড আছে। আমার নেই। খু-উ-ব খুব আপেক্ষ হত। খুব খারাপ লাগত। কিন্তু কোনো সুন্দরীকে প্রস্তাব দেবার মতো স্নায়ুশক্তি আমার ছিল না। যতই মেয়েদের দেখি ততই হতাশ হই। পৌঁছতে পারি না। তবে কী মনের মানুষ জুটবে না এ জীবনে ! আমি কি বিন্দুমাত্র আকর্ষণীয় নই ! খুব কুৎসিত, কিম্ভূতকিমাকার ? আমি কী কোনো একজন নারীর প্রেমাষ্পদ হতে পারি না। নিদেন পক্ষে বয়ফ্রেন্ড ..........! 

১৯৮৮ সাল। শ্রীময়ী আমাদের পাড়ায় পড়াতে আসত। আমার বোনের সঙ্গে পরিচয় হবার সুবাদে আমাদের বাড়িতেও আসা-যাওয়া ছিল শ্রীময়ীর।প্লাবনে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো ওকেও আঁকড়ে ধরার বাসনা হল। উপমার জন্যই উপমা। ওকে খড়কুটোবলে বিশেষিত করে ছোটো করব না। ছোট্ট একটা চিরকুটে ছোট্ট একটা বাক্যে আমার অভীপ্সা জানিয়ে দিলাম, এক বুক সাহসে ভর করে। খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম প্রত্যাখ্যাত হব না তো!

না, প্রত্যাখ্যাত হইনি। গাছে না-উঠতেই যেন এক কাদি। আমার প্রস্তাব অনুমোদিত হল, সহাস্যেই। আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম। শ্রীময়ীও কি আমার প্রস্তাবের জন্য অপেক্ষা করে ছিল ! জানি না। কোনোদিন এ বিষয়ে প্রশ্নও করিনি। তবে সেদিন নিজেকে গর্বিত পুরুষ মনে হল। ওর জন্যই সেদিন থেকে নিজেকে একজনপুরুষবলে আইডেন্টিটি খুঁজে পাচ্ছিলাম। 

মানুষ দাঁড়াতে পারলে বসতে চায়, বসতে পেলে শুতে চায়। আমারও ছুঁতে ইচ্ছে হল।
 
সেদিন ছিল দোলের দিন। দোল আমি কখনোই খেলি না। কোনোদিন না। তাই ফি-বছর ঘরবন্দিই থাকি। রান্নার কাজে বোনকে সাহায্য করছিলাম। কাজের মেয়ে, বোন এবং আমি মিলিয়ে বাড়িতে তিনজনই ছিলাম, চারজন হলাম শ্রীময়ীর উপস্থিতিতে। শ্রীময়ী বোনের কাছে জানতে চাইল, আমি দোল খেলছি না কেন। দ্বাদশবর্ষীয়া কাজের মেয়েটি আগ বাড়িয়ে জানাল, দাদা রং খেলে না। -- তোমার দাদার রং আছে যে খেলবে ! শ্রীময়ীর তির্যক বাক্যবাণ আমার বুকে বিঁধল। সেদিনই প্রথম অনুভূত হল এক নারী-শরীরের স্পর্শ।ভাব হয়ে গেল। প্রতিদিন দু-বেলা ওকে না দেখলে একদম ভালো লাগত না। মন উচাটন হয়ে যেত। শ্রীময়ীও চলে আসত প্রতিদিন, দু-বেলাই। একটা সময় শরীরীভাবেও জড়িয়ে পড়লাম। 

এইভাবে চলছিল দিন-রাত-মাস-বছর। ভাবলাম ওকে আমার প্রেমের স্বীকৃতি দিতে হবে। ওকে নিয়েই সংসার পাতার স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। সংসার কীভাবে পাতব ? তখন তো কাঠ-বেকার। একটা ভালো কাজের আশায় এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকলাম। এক ভদ্রলোকের প্ররোচনায় বেনারস চলে গেলাম কাজের আশায়। দীর্ঘ দু-বছর মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম সেখানে। সবই নিষ্ফলা হল। কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছিলাম। মাকে চিঠি লিখে জানালাম, আমি ঠগের পাল্লায় পড়েছি। বাড়ি ফেরার টাকা নেই। কিছু টাকা পাঠাও মানি অর্ডারে। আমাদের তখন ল্যান্ডফোন ছিল না। মোবাইল নামটা তখনও পর্যন্ত কেউ শোনেনি। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে শুধুই চিঠি।

কয়েকদিন পর দেখি স্বয়ং মা এসে হাজির, বেনারসে। আমাকে আবিষ্কার করলেন, বললেন, “এখনই বাড়ি চলো।আমি বললাম, “মা, আর দুটোদিন দেখে যাই। যদি কিছু হয়। তুমি চলে যাও মা সেদিন চলে এসেছিল বটে। পড়ে ব্যাপারটা ভেবে অসম্ভব খারাপ লাগছিল। মাকে কি একা একা ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া একদম ঠিক হয়নি। পরে ভাবলাম, কী করে পারলাম মাকে একা বিদেশ-বিভুঁইয়ে ছেড়ে দিতে ! তাহলে কি মা-ছেলের বন্ডিংয়ে কোনো ত্রুটি আছে! কে জানে।

অবশেষে দু-দিন পর শীর্ণকায় ভগ্নদেহে বাড়ি ফিরলাম।অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।পরদিন সকালে শ্রীময়ীর খোঁজ করলাম। কেউই ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারল না। আমি সে সময় সন্ধ্যা হলেই বনগাঁ রেলস্টেশনের রেলওয়ে হুইলার জগন্নাথ-বলরামের বইপত্রের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতাম।এমনই এক সন্ধ্যায় আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল অপার বিস্ময়। 

-- “আপনার বন্ধুকে একটু আমার সঙ্গে কথা বলতে বলবেন ?” আমি দোকানের যেদিকে দাঁড়িয়েছিলাম, তার উলটোদিক থেকে কথাগুলি ভেসে এল আমার কানে।

-- “বিপ্লব, তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়জগন্নাথ বলল।

চোখ তুলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড় ! দোকানের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক নববধু। লালের আধিক্য শরীর জুড়ে।শ্রীময়ী, নববধুরূপে শ্রীময়ী। নতুন বউকে যেমন অতি সুন্দরী লাগে, ওকেও তেমনি লাগছিল। আমার বুকের ভিতর যেন সিরিয়াল বিস্ফোরণ হয়ে চলছিল। তপ্ত লাভা হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল যেন হৃদপিণ্ড ।আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কথা হারিয়ে গেল। মাথার ভিতর সব ব্ল্যাংক।আমার সঙ্গে কি কথা বলা যাব না?” – শ্রীময়ীর নরম প্রশ্নে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলাম ওর দিকে।এগিয়ে গেলাম বটে, কিন্তু মুখ থেকে যেন কথা সরছিল না। একটা দম বন্ধ-করা অবস্থা। ওর দিকে তাকাতে পারছিলাম নাও আজ পরস্ত্রী হয়ে গেছে, অথচ কালও তো ভেবেছিলাম আমার বউ হবে ! খুব তাড়াতাড়ি ছেলে দেখে আমায় বিয়ে দেওয়া হল।আমার কিছু করার ছিল না, বিয়েতে বসে যাওয়া ছাড়া। এই দেখো আমার বরের ছবি--- আমার হাতে পোস্টকার্ড সাইজের একটা ফোটোগ্রাফ দিল। তারপর আবার বলতে শুরু করে দিল – “এ বর আমার পছন্দ হয়নি।তার ওপর ও জেনে গেছে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। তোমার একটা চিঠি ও পেয়ে গেছিল। আমার সঙ্গে শোয় পর্যন্ত না। বলে আমার সঙ্গে ও শারীরিক সম্পর্ক করলেও নাকি আমাদের সন্তান তোমার মতোই দেখতে হবে
 
--সব্বোনাশ, সেকি ! তোমার বাবা-মা জানতেন আমাদের সম্পর্কের কথা, তোমার দিদিরাও তো জানতেন। তাহলে ধরে-বেঁধে তোমায় বিয়ে দিলেন কেন ! তুমি আপত্তি করোনি?”
-- “কে শুনবে আমার আপত্তি ? ওদের যুক্তিতে আমার হার মেনে নিতে হয়েছিল
-- কী যুক্তি?”
–- “তোমরা কুলীন ব্রাহ্মণ, আমরা কৈবর্ত। এমন বিয়ে মহাপাপ। তুমি আমার বর হলে জামাই হিসাবে নিশ্চয় আমার মা-বাবাকে প্রণাম করতে…..সেই ব্যাপারটা আমাদের কাছে মহাপাতক হত
-- এমন সমস্যা হয় আগে তো কখনো জানাওনি ! তোমাদের জাতপাতের জাতাকলে সম্পর্ক শেষ ?”
 – “নিয়ম ভাঙার ক্ষমতা বা সাহস সবার হয় না। আমাদেরও হয়নি, আমারও না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা নিয়মের দাস। তবে আমাকে ভুলে যেয়ো না। এ জীবনে তোমার বউ হতে পারলাম না বলে বন্ধুত্ব হওয়া থেকে বঞ্চিত কোরো না। বন্ধুত্বে কোনো নিষেধাজ্ঞা রাখেননি ঈশ্বর ! যাতায়াতের পথে দেখা হলে কথা বোলো। ডাক দিলে সাড়া দিয়ো । এড়িয়ে যেয়ো না, এড়িয়ে গেলে খুব কষ্ট পাবো

না, আর কোনোদিন শ্রীময়ীর সঙ্গে দেখা হয়নি। এক অনিবার্য কারণে বনগাঁর বাড়ি বিক্রি করে মধ্যমগ্রাম চলে এলাম। শুনেছি চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়। মনের আড়াল ! শ্রীময়ী এখন কেমন আছে ? কেমন দেখতে হয়েছে ? বুড়ি হয়ে গেছে আমার মতো ?

আপনকথা-যাপনকথা : ১



সালটা ১৯৯৩ তখন মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর শহরে দৈনিক সব্যসাচী”-তে চাকরি করতাম ওই সংবাদপত্রে কাজ করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়েছিল কালুদা, সুধাংশুদা, রঞ্জিতদা, জাকির এবং আনোয়ারের সঙ্গে সুধাংশুদা এবং রঞ্জিতদা আমার থেকে বয়সে সিনিয়ার ছিলেন, জাকির, আনোয়ার এবং আমি সমবয়সিই ছিলাম বলতে গেলে  জাকির ছিল আমার ছায়াসঙ্গী ইদের আগের দিন জাকির আমাকে বলল, “আমার সঙ্গে একটু বেরবে ?” আমি বললাম, “কোথায় ?” জাকির বলল, “কাল ইদ আছে কিছু কেনাকেটা করব“ –- জামাকাপড় কিনবে? –- না গো, খাবার-দাবার কিনব

বিকেল-বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম বাজারে সন্ধেয় ডিউটি ঠিক যখন বাজারের মুখটাতে পৌঁছলাম, জাকির আমার হাত টেনে ধরল আমি হতচকিত হয়ে বললাম, “কী হল ?” জাকির বলল, “বাজারের ভিতর ঢোকার সময় ডানদিকে একদম তাকাবে না আমি বললাম, “কেন, কী হয়েছে ?” –- যা বললাম, সেটাই করো প্রশ্ন কোরো না

না, আমি জাকিরের কথা শুনিনি কারণ অত ভালো ছেলে আমি নই কথা অমান্য করলাম ডানদিকে তাকাতেই দেখলাম মাংসের দোকান, সারি সারি কয়েকটা দোকানে গোরুর মাংস ঝোলানো আছে পাছে জাকির দেখে ফেলে আমি ডানদিকে তাকিয়েছি, তাই দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে সিম্যুই হাত দিয়ে পরীক্ষার ছলনা করতে থাকলাম আমার হাতে-ধরা সিম্যুই দেখে জাকির বলল, “তোমার এটা পছন্দ ?” তারপর দোকানদারকে বলল, “এটাও দিয়ে দিন

আগামীকাল আমার ইদের নেমন্তন্ন হল এটাই আমার ইদের প্রথম নেমন্তন্ন তাই রাখবার দায় আছে আর নেমন্তন্ন মানেই তো ব্যাপক ভোজন তার উপর ভাবলাম, মুসলিমদের উৎসবে নেমন্তন্ন, নতুন নতুন রেসিপি তো মিলবেই জাকিরকে মজা করে বললাম, “মেনুর বিস্তারিত বিবরণ দাও পোষালে যাব, না পোষালে ….” জাকির বলল -- সিম্যুই, লাচ্চা-সিম্যুই, ফিরনি ছাড়াও নতুন কিছু আইটেমও পাবে আমি উজ্জীবিত হয়ে বললাম, “নতুন আইটেম ? বিফ, মানে গোরুর মাংসও ?” –- “চো----- জাকিরের ওই দাবড়ানিতে আমার প্যান্ট হলুদ হয়ে যাওয়ার জোগাড় ! –- কী হল, এত ক্ষেপে যাওয়ার মতো আমি কী বলেছি ? – না, কিছু বলোনি যা বলেছ তা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ কোরো না বাবা শুনলে আমার কল্যা কেটে কংসাবতীতে ভাসিয়ে দেবে এটা গুনাহ্
পরদিন দাশপুরে জাকিরের বাড়িতে আপ্যায়ন ? উঃ, জাস্ট ভাবা যায় না ! ভিভিআইপি সন্মান কথা হল পরিবারের সকলের সঙ্গে ছোটোদের চুমু, আর বড়োদের প্রণাম সেরে বসলাম এলেন মা, জাকিরের মা স্পেশাল পরিচয় পর্ব মায়ের মুখমণ্ডলে যে উচ্ছ্বাস দেখতে পেলাম, তাতে মনে হল উনি যেন অনেকদিন পর তাঁর হারানো ছেলে ফিরে পেয়েছেন মা বোধহয় এমনই হয় মায়ের কোনো ধর্ম হয় না, জাত হয় না, বর্ণ হয় না, দেশ হয় না মা মা- হয়
দরজার বাইরে জনা দশেক মুখ অপেক্ষা করছে তাদের দু-হাতে ভোজনপাত্র জাকির বলল, “উপরে উঠে বসো খেয়ে নাও উপর,  মানে একটা মাঝারি মাপের চৌকি চৌকির উপর ধবধবে সাদা কাপড় বিছানো মোটা গদি গদির উপর ওই ভোজনপাত্রগুলি অর্ধবৃত্তাকারে সাজিয়ে দেওয়া হল মা বললেন, “বাবা, বসে পড়ো খেয়ে নাও যেটা বেশি ভালো লাগবে, সেটা চাইবে আমার তো চক্ষু চড়কগাছ ! এত খাবার খাব কীরূপে

জাকির বাঁচালোযেটা তোমার পছন্দ সেটা তুমি খাও মা গল্প বলার জন্য উশখুস করছেন মা গল্প করতে খুব ভালোবাসেন একবার শুরু করলে থামতে চান না”—জাকির একথা জানাতেই আমিও লুফে নিলাম অফার বললাম, “আমিও গল্প শুনতে ভালোবাসি তারপর শুরু হয়ে গেল গল্প বলা যেন খই ফুটছে সম্প্রীতির গল্প, বিচ্ছেদের গল্প, দেশভাগের গল্প, একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে চলে আসার গল্প, জীবন-সংগ্রামের গল্প, ধর্মসংকটের গল্প –- কত গল্প, গল্পের কত ডাইমেনশন, কত শেড

  -- খোদা হাফিজ
  -- আমি বললাম, “সব্বাই ভালো থাকবেন, সব্বাই